‘এদেশের লাখো কোটি মানুষ চায় তারেক রহমানের জীবন সফল হোক। আমিও তাদের একজন। তার পথের দুপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য কণ্টক। এসবকে এড়িয়ে চলতে হবে তাকে, আর খুঁজে পেতে হবে সৎ, সাহসী, সৃজনশীল বান্ধবদের। জাগ্রত রাখতে হবে সর্বক্ষণ তার বিবেককে। বুদ্ধির পরিবর্তে প্রজ্ঞার নির্দেশ মেনে চলতে হবে। মস্তিষ্কের চেয়ে অন্তঃকরণের নির্দেশনাই এদেশে অধিক কার্যকর হয়েছে, সব সময়। তারও পথনির্দেশনা দিক তার বিবেক, তার অন্তঃকরণ।’Ñপ্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ, দৈনিক নয়া দিগন্ত, নভেম্বর ২০, ২০১৮
তারেক রহমানের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু জনগণ। তিনি বিশ্বাস করেন, দলের শক্তি জনগণ থেকে আসে এবং জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো দল স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারে না। তাই তিনি রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেন জনগণনির্ভর অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে। ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং জনগণকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে চান তারেক রহমান। তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষÑ ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, পেশা, লিঙ্গ, বয়স, অঞ্চল বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমান অধিকার ও সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। তার অন্তর্ভুক্তি দর্শন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমতার ওপর ভিত্তি করে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো অন্তর্ভুক্তি, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং বিকেন্দ্রীকরণের ধারণা। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমাজের প্রান্তিক জনগণ, নারী, শ্রমিক, কৃষক, দলিত, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, প্রবাসী ও তরুণরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এই দর্শনের মূল চেতনা হলো জনগণকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা। তারেক রহমান বারবার বলেছেনÑ ‘বাংলাদেশের জনগণ আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা।’ এই বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি তার রাজনীতির মূল চেতনার প্রতিফলন, যেখানে রাজনীতি মানে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং তাদের আশা-আকাক্সক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপদান ও তার যথাযথ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার।
তারেক রহমানের রাজনীতির অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু রাজনৈতিক কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নন। তিনি গণতন্ত্রকে কেবল ভোটের অধিকার হিসেবে নয়, বরং নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তার মতে, গণতন্ত্রের শক্তি আসে জনগণের জ্ঞান, সংলাপ ও সমঝোতার চর্চা থেকে। তাই তিনি সব সময় উন্মুক্ত আলোচনার পক্ষে এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বিএনপির নেতৃত্বে তিনি যে সংগঠন পরিচালনা করেন, সেখানে সব স্তরের নেতাকর্মীদের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া চালু করেছেন, যা তার অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের বাস্তব উদাহরণ।
তারেক রহমানের রাজনীতি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্য বহন করেন। তিনি মনে করেন, উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপি বৃদ্ধি নয়, বরং সমান সুযোগ ও ন্যায্য বণ্টনের মাধ্যমে সব মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। এ জন্য তার রাজনৈতিক দর্শন অর্থনীতিকেও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তিতে সাজাতে চায়Ñ যেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও সামাজিক সুরক্ষা সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা হবে। তার প্রস্তাবিত ভিশন-২০৩০ এবং বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচিতে এই চিন্তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদ তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করেছিলেন। এই জাতীয়তাবাদ ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক ও বৈষম্যহীন। তারেক রহমান এটি বর্তমান সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন অর্থে ব্যাখ্যা করেছেনÑ যেখানে নাগরিক অধিকার, অংশগ্রহণ ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি জাতিসত্তার সঙ্গে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদী সমাজকে একত্রিত করেছেন।
তারেক রহমান রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতা বা দলীয় প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তার মতে, প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য সৃষ্টিশীল পদক্ষেপ হতে হবে। এই নীতিভিত্তিক রাজনীতিই তাকে গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রমাণিত করেছে। তার বক্তব্য, ‘একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি তখনই কিছু অর্জন করেছি বলতে পারব, যেদিন বাংলাদেশের জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারব।’ তার এই উক্তি কেবল রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং জনগণের ভোটাধিকারকে গণতন্ত্রের প্রাণ হিসেবে গণ্য করার একটি নৈতিক দর্শনও বর্ণনা করে।
তারেক রহমানের রাজনীতি মানবিক রাজনীতির প্রতীক। তিনি নারীশিক্ষা, শিশু অধিকার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং প্রান্তিক জনগণের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তার দৃষ্টিতে উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সমাজের শেষ প্রান্তের মানুষও উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে। এই দার্শনিক ও মানবিক মনোভাব তাকে শুধু রাজনৈতিক নেতা নয়, বরং মানবিক চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
রাজনীতিতে তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো জনগণের কথা শোনার সংস্কৃতি। তিনি বিশ^াস করেন, জনগণকে না শুনে কোনো সরকার বা নেতা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। তাই তিনি অংশগ্রহণমূলক কাঠামো, সংলাপ ও পরামর্শকে অপরিহার্য বলে মনে করেন। এই নীতি রাজনৈতিক সংগঠনকে গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে। অতীতে বাংলাদেশে রাজনীতি প্রায়ই দলীয়করণ, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ও ব্যক্তিনির্ভরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তারেক রহমান সেই ধারাকে ভেঙে জনগণকেন্দ্রিক, সৃজনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
তারেক রহমানের অন্তর্ভুক্তি দর্শনের মূল চেতনা হলোÑ রাষ্ট্রের কাঠামো ও নীতি এমনভাবে গঠিত হবে, যাতে সব নাগরিক সমানভাবে অংশগ্রহণ এবং অধিকার অর্জন করতে পারে। তার মতে, জনগণকে রাজনীতিতে সক্রিয় না রেখে এবং তাদের অধিকারবঞ্চিত করে কোনো সরকার টেকসই উন্নয়ন বা ন্যায্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। অন্তর্ভুক্তি তার কাছে শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি মানবিক ও নৈতিক দর্শন, যেখানে নাগরিক পরিচয় বিভাজন নয়, বরং ঐক্য ও মর্যাদার প্রতীক।
তার অন্তর্ভুক্তি দর্শন রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব বিস্তৃত। তারেক রহমানের মতে, অন্তর্ভুক্তি অর্থনীতি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছায়। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, নারী উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাÑ সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি দর্শনের মূল লক্ষ্য। বিএনপির ‘৩১ দফা’ ও ‘ভিশন ২০৩০’-এ এই নীতির প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে ঢাকার বাইরেও উন্নয়ন কার্যক্রম সমান গুরুত্বের সঙ্গে সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
তারেক রহমানের দর্শনে মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। প্রতিটি নাগরিকÑ ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরুÑ সবাই সাম্য ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারী। রাষ্ট্রের কাজ হলো প্রতিটি মানুষের অধিকার সুরক্ষিত রাখা, যাতে কেউ অবহেলিত না থাকে।
তারেক রহমান রাজনীতিকে জনগণনির্ভর প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ও উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই দর্শনের মর্ম। তার ভাষায়, ‘গণতন্ত্র মানে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া।’ তিনি দলের ভেতর কেন্দ্রীয় স্তর থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী পর্যন্ত সবার মতামত গ্রহণের সংস্কৃতি চালু করেছেন। এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরল উদাহরণ। তার কাছে বহুত্ববাদ কোনো বিভাজন নয়, বরং শক্তির উৎস। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি বা মতভেদ সত্ত্বেও মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে, যদি সবার প্রতি শ্রদ্ধা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়নের ধারাবাহিকতায় পথচলা অব্যাহত রেখেছে।
তারেক রহমানের দর্শন বিশ^রাজনীতিতেও প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক সংঘাত ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের সময়েও এই দর্শনই ন্যায়, অংশগ্রহণ ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। আজকের বিশে^ যখন বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বাড়ছে, তখন তার প্রস্তাবিত অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক দর্শন মানবতার সমাধান হতে পারে। তিনি মনে করেন, মানবজাতির টিকে থাকার জন্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রয়োজনÑ যেখানে উন্নয়ন, পরিবেশ, অধিকার ও শান্তি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র মানবতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার টেকসই পথ।
তারেক রহমানের অন্তর্ভুক্তি দর্শন হলো মানবিক গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত, যা রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে একসূত্রে বেঁধে দেয়। জনগণের নেতা, সংগঠক, প্রকৃতি ও প্রাণীর বন্ধু আর মানবিক কর্মকাণ্ডে সহানুভূতি, দায়িত্ব ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাÑ এ সবই অন্তর্ভুক্তি চিন্তা-মনন-দর্শনের বহিঃপ্রকাশ। তার এই চিন্তা বাংলাদেশের রাজনীতিকে শুধু পথই দেখাচ্ছে না, বরং গণতন্ত্রের ধারণাকে আরও গভীর ও মানবিক করে তুলছে। তিনি দেখিয়েছেনÑ রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেটি ক্ষমতার জন্য নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত হয়।
শেখ রফিক : গবেষক ও কলাম লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব
daliykalerbangladesh