১৫ আগস্টকে ঘিরে সম্ভাব্য নৈরাজ্য প্রতিরোধে বন্দর থানা যুবদল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি শাহেনশাহ আহমেদের নির্দেশে এ কর্মসূচি তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় শুরু হয়, যা গভীর রাত পর্যন্ত চলে।
বন্দর থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আলীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলের সভাপতি জয়, বন্দর উপজেলা কৃষকদলের সভাপতি মো. ফারুক মিয়া, বন্দর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. সোহেল প্রধানসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আহাদ, মাহফুজ, রকি, শান্ত, ফারুক, শেখ রুবেল রোমান, মমিন, আরাফাত, মাহবুব, মো. শুভ, নাজমুল হুদা, মো. আরমান, সাদ্দাম, মমিনুল ইসলাম ও তানভির প্রমুখ।
কর্মসূচির প্রেক্ষাপট
১৫ আগস্ট বাংলাদেশে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়, শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার স্মরণে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এ দিবসকে ঘিরে নানাবিধ উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর অভিযোগ—আওয়ামী লীগ এই দিনটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিরোধী দলের উপর দমন-পীড়ন চালায় এবং বিভিন্ন এলাকায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করে।
বন্দর উপজেলা ও আশপাশের এলাকায় এর আগেও জাতীয় দিবসগুলোতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগের বছরগুলোতে শোক দিবসের আগে ও পরে দু’দলীয় সংঘর্ষ, মিছিল আটকানো, ব্যানার ছেঁড়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে এবার যুবদল আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে না পারে।
অবস্থান কর্মসূচির লক্ষ্য ও প্রস্তুতি
বন্দর থানা যুবদলের নেতারা জানান, অবস্থান কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো এলাকাবাসীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আওয়ামী লীগের কোনো ‘দোষর’ যাতে সহিংস কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে না পারে তা নিশ্চিত করা। কর্মসূচি শুরুর আগে স্থানীয় নেতারা এলাকায় টহল দেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান নেন।
যুবদল নেতা আহমেদ আলী বলেন, "আমরা এখানে কোনো সংঘর্ষ চাই না। জনগণ শান্তিতে থাকবে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আওয়ামী লীগের দোসররা বারবার নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে, এবার আমরা সতর্ক আছি।"
তিনি আরও জানান, এই অবস্থান কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কোনো স্লোগান বা উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়নি, বরং নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়ে সতর্ক অবস্থায় সময় কাটিয়েছেন।
নেতাকর্মীদের একাত্মতা
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নারায়ণগঞ্জ মহানগর মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম দলের সভাপতি জয় বলেন, "১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে অতীতে যেভাবে বিরোধী দলের উপর হামলা চালানো হয়েছে, এবার আমরা আগে থেকেই মাঠে আছি। আমরা চাই কোনো প্রকার সহিংসতা ছাড়াই দিনটি পার হোক।"
বন্দর উপজেলা কৃষকদলের সভাপতি মো. ফারুক মিয়া বলেন, "জনগণের জানমাল রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলেও সহিংসতার পথে বিশ্বাস করি না।"
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. সোহেল প্রধান জানান, এই অবস্থান কর্মসূচি শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেও আয়োজন করা হয়েছে। তার ভাষায়, "আমরা রাজনীতি করি জনগণের জন্য। নৈরাজ্য ঠেকানো মানে শুধু আমাদের দলের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।"
অতীতের অভিজ্ঞতা
স্থানীয়রা জানান, আগের কয়েক বছরে শোক দিবসের আগে-পরে বন্দরে অন্তত ৩–৪ বার সংঘর্ষ হয়েছে, যেখানে ককটেল বিস্ফোরণ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং যানবাহন ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় নিরীহ পথচারী ও সাধারণ ব্যবসায়ীরাও এই সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে এবারের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
টোল প্লাজা এলাকার দোকানদার রফিকুল ইসলাম বলেন, "আগে এই সময়গুলোতে দোকান বন্ধ করে দিতে হতো ভয়ে। কিন্তু আজ যুবদলের অবস্থান কর্মসূচির কারণে আমাদের মনে সাহস এসেছে।"
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পুলিশের ভূমিকা
অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। বন্দর থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, তারা উভয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। তিনি বলেন, "আমরা চাই না কোনো দলীয় সংঘর্ষে সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হোক। তাই উভয় পক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।"
যুবদল নেতাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে এই কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন। যদিও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে কয়েকজন এলাকাবাসীর মধ্যে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়নি।
আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া
বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "বিএনপি নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে এ ধরনের কর্মসূচি করছে। ১৫ আগস্ট আমাদের জন্য শোকের দিন, এখানে নৈরাজ্যের প্রশ্নই আসে না।"
তবে তিনি স্বীকার করেন, অতীতে দুই দলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং সেটি কোনো পক্ষের জন্যই ভালো ছিল না।
কর্মসূচির সমাপ্তি
রাত ১২টার পর অবস্থান কর্মসূচি শেষ হয়। নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে এলাকা ত্যাগ করেন এবং আগামী দিনগুলোতেও সতর্ক থাকার ঘোষণা দেন। কর্মসূচির পর এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি দেখা দেয়।
যুবদল নেতা আহমেদ আলী বলেন, "আমরা প্রমাণ করেছি, রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই সহিংসতা নয়। সচেতন হলে যে কোনো নৈরাজ্য ঠেকানো সম্ভব।"
daliykalerbangladesh