রিকশার শহরখ্যাত রাজধানী ঢাকার বড় বিশৃঙ্খলার নাম রিকশা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রিকশার শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন করে ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশা (ইলেকট্রিক-রিকশা) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ইতিবাচক এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিরাজ করছে বিশৃঙ্খলা। পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে পদে পদে অনিয়ম করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কিছু প্রতিষ্ঠানকে ডেকে খেয়াল-খুশিমতো প্রতিষ্ঠান বাছাই করছে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তির স্বার্থে রাজধানীর রিকশার সমস্যা সমাধানের উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঢাকার জন্য বড় দুঃখজনক বিষয়। ভালো এই উদ্যোগটি স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন না করলে রিকশা সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি কোনো দপ্তর বা সংস্থা কোনো উন্নয়ন কাজ, পণ্যসামগ্রী বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে। এটা সাধারণত পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ই-রিকশা তৈরির কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। দুই সিটি করপোরেশন নিজেদের মতো করে কিছু প্রতিষ্ঠানকে ডেকে সেখান থেকে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ‘বাছাই’ করেছে। এক্ষেত্রেও অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ই-রিকশা তৈরির কাজ পেতে শুরুতে যুক্ত হয় আকিজ মোটরস, মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিং ও নিউ গ্রামীণ মোটরস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান তিনটি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দেওয়া ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কয়েকটি রিকশা তৈরি করে। সেগুলো তারা ই-রিকশাসংক্রান্ত কারিগরি কমিটিকে দেখিয়েছে। ওই সময় ডাইস্টার হাইটেক পাওয়ার অটোমোবাইল লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান কোনো রিকশা দেখায়নি। তবে ১৮ আগস্ট ই-রিকশাসংক্রান্ত কারিগরি কমিটির সভায় ডাইস্টারকে বাছাই করা হয়। ওই দিন উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত হননি। তবুও তারা চূড়ান্তভাবে বিবেচিত হন।
ওই সভায় আকিজ মোটরস, মনির অটো, নিউ গ্রামীণ মোটরসের ই-রিকশা যথাযথ হয়নি বলে জানানো হয়। তাদের বুয়েটের ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে রিকশা তৈরি করতে বলা হয়। এরপরের কাজ হওয়ার কথা ছিল-বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে তিন প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন যাচাই-বাছাই করা। কিন্তু কোনো কিছু না করেই ডাইস্টার হাইটেক পাওয়ার ও আকিজ মোটরসকে পরের ধাপে বিবেচনা করা হয়। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে গ্রামীণ মোটরস ও মনির অটো। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তাদের মতে, তারাও নির্দেশনা অনুযায়ী সবকিছু করেছেন। কিন্তু তাদের কেন বাদ দিল আর আকিজ মোটরসই বা কিভাবে বাছাই হলো-সেটা তারা বুঝতে পারছেন না।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৮ আগস্ট ই-রিকশার কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষাসংক্রান্ত সভার কার্যপত্রে দেখা যায়, সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়-ই-রিকশার অনুমোদিত স্পেসিফিকেশন ও ডিজাইন অনুসরণ করে আকিজ মোটরস, নিউ গ্রামীণ মোটরস এবং মনির অটো নতুন করে ই-রিকশা প্রস্তুত করে পুনরায় উপস্থাপন করবে। আর ডাইস্টার হাইটেক পাওয়ারের ই-রিকশা অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী করা হয়েছে। দ্রুতই ই-রিকশাটি স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে টাইপ অনুমোদন কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে।
এ বিষয়ে কারিগরি কমিটির এক সদস্য জানান, কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্ত অমান্য করে আকিজকে বাছাই করা হয়েছে। আর ডাইস্টারের রিকশার স্পেসিফিকেশন ও ডিজাইন ঠিক আছে বলা হলেও কারিগরি কমিটির সদস্যদের ওই রিকশা দেখানোই হয়নি। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভালো উদ্যোগের একটি রাজধানীর রিকশার শৃঙ্খলা ফেরানো। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার কোথাও কোথাও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়েছে। এজন্য ভালো উদ্যোগটি ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে এটা ভেস্তেও যেতে পারে।
বাছাই দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য : এ বিষয়ে ডাইস্টার হাইটেক পাওয়ার অটোমোবাইলসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা সিটি করপোরেশনের কারও মাধ্যমে ই-রিকশা তৈরির বিষয়টি জানতে পারি। পরে বুয়েটের স্পেসিফিকেশন ও ডিজাইন অনুযায়ী রিকশা তৈরি করি। ইতোমধ্যে আমাদের প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়েছে।
এ বিষয়ে আকিজ মোটরসের রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা ই-রিকশা তৈরি করেছি। কারিগরি কমিটি আমাদের কিছু সংশোধনী দিলে সেটিও করেছি। এরপর সিটি করপোরেশন আমাদের চূড়ান্ত করে। ইতোমধ্যে কারিগরি কমিটি আমাদের ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করেছে। সবকিছু ইতিবাচক। কার্যাদেশ পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি আরও জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে তারা জানতে পেরেছেন-প্রথম পর্যায়ে ১ লাখ ই-রিকশা তৈরি করবে সরকার। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১ লাখ। এভাবে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ই-রিকশা তৈরি করা হবে।
বাদপড়া প্রতিষ্ঠান দুটির বক্তব্য : নিউ গ্রামীণ মোটরসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহিন যুগান্তরকে বলেন, কারিগরি কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা ই-রিকশা তৈরি করেছি। কিন্তু আমাদেরটা দেখা হয়নি। একই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আকিজ মোটরসেরও অবস্থান একই হওয়ার কথা। কিন্তু রহস্যজক কারণে তারা বিবেচিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. মনির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আকিজ ও ডাইস্টার কিভাবে বাছাই হলো তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা, যেদিন ই-রিকশা দেখানোর কথা সেদিন ডাইস্টার রিকশা দেখাতে পারেনি। এছাড়া সবশেষ মিটিংয়েও তারা ছিলেন না। আর ১৮ আগস্টের সভায় আকিজ মোটরসের ব্যাপারেও যে নির্দেশনা দেওয়া হয়, অন্য আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে একই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই পর্যায়ে আকিজ মোটরসের বাছাই কোনো বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মহাব্যবস্থাপক (পরিবহণ) এবং ই-রিকশা কারিগরি কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শওকত ওসমান যুগান্তরকে বলেন, ই-রিকশা তৈরিসংক্রান্ত কাজের জন্য প্রতিষ্ঠান আহ্বানের কোনো বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় দেওয়া হয়নি। তবে ফেসবুকে সম্ভবত দেওয়া হয়েছে। ‘প্রক্রিয়াগত অস্বচ্ছতা’ থেকে যায় কিনা-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যায়নি। প্রয়োজন হলে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যাবে।
তিনি জানান, ই-রিকশাসংক্রান্ত কমিটি গঠনেও ভুল রয়েছে। এখনো নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি। এসব ঠিকঠাক না করে ই-রিকশা তৈরি করা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সভা হয়েছে। আগে ঢাকার রিকশা না সরিয়ে নতুন রিকশা তৈরি করলে জটিলতা বাড়বে। এ কারণে এতদিন যা হয়েছে, সেখানে কোনো ভুলত্রুটি হলেও তা শুধরে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মহাব্যবস্থাপক (পরিবহণ) এবং ই-রিকশাসংক্রান্ত কারিগরি কমিটির সদস্য মোহাম্মদ নাছিম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ই-রিকশা তৈরির প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের কাজ মূলত উত্তর সিটি করপোরেশন করছে। কেননা, এই কাজ যখন শুরু হয়, তখন ডিএসসিসির অফিস বন্ধ ছিল। ওই কারণে উত্তর সিটি এ কাজের সঙ্গে বেশি জড়িয়েছে।
তিনি বলেন, কারিগরি কমিটির কাছে যেদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ডিজাইনে ই-রিকশা নিয়ে আসেন, সেদিন ডাইস্টার দেখাতে পারেনি। এরপরও কিভাবে ওরা চূড়ান্ত হলো বুঝতে পারছি না। তবে কারিগরি কমিটির আরও সভা হবে। মন্ত্রণালয়েও সভা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক করে কাজ দেওয়া হবে।
daliykalerbangladesh