পুকুরপাড়ে উঁচু উঁচু গাছ। এসব গাছে অন্তত হাজার দশেক পাখির বাস। শীতকালে পরিযায়ী পাখিরাও আসে। প্রায় ৫০ বছর ধরে শান্তিতেই ছিল। কিছু দিন ধরে তাদের আবাস চিনেছে ‘যমে’। প্রায় প্রতিদিন পাখি শিকার করছে কিছু লোক। বিষাদে পরিণত হয়েছে পাখির রাজ্য। এই ঘটনা কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কলাকান্দ ইউনিয়নের কালাচানকান্দি গ্রামের প্রয়াত ইউপি সদস্য শাহাদাত হোসেন সরকারের বাড়ির পুকুরপাড়ের।
বক, শামুকখোল, পানকৌড়ি, বালিহাঁস, ওহা, বুনোহাঁসসহ বিভিন্ন প্রকার মৌসুমি পাখি প্রজন্মের পর প্রজন্ম পুকুরপাড়ের গাছগুলোতে বাসা বেঁধে বাস করছে। গ্রামবাসীর কাছে এই দৃশ্য ছিল এক অনন্য সৌন্দর্য, ছিল গর্বের বিষয়। কিন্তু হঠাৎ করেই পাখির রাজ্যে দুঃস্বপ্ন নেমে এসেছে। এলাকার কিছু নির্দয় লোক লাঠি হাতে বাসা ভেঙে যখন ছানা ধরে নিচ্ছে, তখন মা পাখির বুক ফেটে কান্না ঝরছে। ডানা মেলে বারবার ছুটে আসছে ছানাদের রক্ষা করতে, কিন্তু নির্মম হাতের কাছে হেরে যাচ্ছে। অসহায় মা পাখির আর্তচিৎকারে কেঁপে ওঠে চারপাশ। ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে শূন্য বাসার দিকে তাকিয়ে থাকে, হারানো সন্তানের খোঁজে পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায়।
আগে ভোরবেলায় পাখির কলকাকলি, বকের ডাক, শামুকখোলের ভেসে আসা সুরে ভরে উঠত চারদিক। কিন্তু আজ পাখির রাজ্যে বিষাদ। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পাখিদের এই আবাস ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, এমনটা ভেবেই আফসোস করছেন এলাকার অনেকে।
সরেজমিন দেখা গেছে, কালাচানকান্দি গ্রামের প্রয়াত ইউপি সদস্য শাহাদাত হোসেন সরকারের পুকুরপাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শতাধিক উঁচু কড়ুই, মেহগনি, আমগাছ, চামলগাছ ও বাঁশঝাড়ে পাখির কলতান। কোনো বাসায় সদ্য পাড়া ডিম, কোথাও ডানা মেলতে না শেখা ছানা, আবার কোথাও বড় হয়ে ওঠা বাচ্চা উড়তে শেখার চেষ্টা করছে। সকাল-সন্ধ্যা মা পাখিরা ঠোঁটে খাদ্য নিয়ে বাসায় ফিরে আসে, তাদের ডানার ঝাপটায় মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। চারপাশের নির্জনতা ভেঙে যেন বিলের মাঝখানে তৈরি হয়েছে পাখির রাজ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতি যেন এখানে আপন হাতে গড়ে তুলেছে এক আশ্রয়, যেখানে পাখিরা নির্বিঘ্নে বাস করছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। কিন্তু কয়েক মাস ধরে এই স্বর্গভূমির ওপর নেমে এসেছে এক অমানবিক থাবা। বাসা ভেঙে ছানা লুটে নিচ্ছে কিছু দুষ্টু লোক, বিক্রি করছে বাজারে। পাখিদের সেই শান্ত আশ্রয়স্থল আজ রূপ নিয়েছে আতঙ্কের রাজ্যে।
অভিযোগ রয়েছে– গ্রামের বাচ্চু মিয়া, মনির, সজীব, শাকিল ও বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা যুবকরা পাখির বাসা ভেঙে ছানাগুলো নামিয়ে আনছে। তারপর সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে, আবার কেউ কেউ বড় পাখি ধরে বিক্রি করছে। মাংসের জন্য এসব পাখি কিনে নিচ্ছে অনেক ক্রেতা।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজ মিয়ার ভাষ্য, গ্রামের গাছগুলোতে কয়েক হাজার বক, শামুকখোল, পানকৌড়ি পাখির দল বাসা বেঁধে আছে বহু বছর ধরে। পাখির ডাকে মন ভরে যেত। এখন প্রতিদিন দেখতে হচ্ছে ডাল ভেঙে বাচ্চা নামিয়ে বিক্রি করার দৃশ্য, যা হৃদয়বিদারক। রহিমা বেগম বলেন, ‘পাখিগুলোকে পরিবারের সদস্যের মতো দেখি। এখন প্রতিদিন এভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছে অথচ প্রশাসন চুপ করে আছে। এটা আমাদের কষ্ট দিচ্ছে।’
পাখি শিকারে জড়িত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, পাখি বিক্রি করে কিছু টাকা উপার্জন করি।’
কালাচানকান্দি গ্রামের সোহেল আহমেদ জানান, পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল এই পুকুরপাড়। কিন্তু কয়েক মাস ধরে কিছু ব্যক্তি পাখির বাচ্চা নামিয়ে বিক্রি করছে। প্রায়ই নামাতে গিয়ে বাচ্চা নিচে পড়ে মারা যাচ্ছে, অনেক বাসার ডিম পড়ে ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় পাখি শেষ হয়ে যাবে।
প্রয়াত ইউপি সদস্য শাহাদাত হোসেন সরকারের ছেলে কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের পুকুরপাড়ের গাছে হাজার দশেক পাখির বসবাস। শীতকালে পাখির সংখ্যা বেড়ে যায়। কলকাকলি অনেক ভালো লাগে। কিন্তু ইদানীং কিছু ব্যক্তি পাখির বাসা থেকে বাচ্চা নামিয়ে বাজারে বিক্রি করছে, যা নিন্দনীয় কাজ। আমরা বাড়িতে থাকি না, এই সুযোগে পাখির আবাস ধ্বংস করছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমাইয়া মমিন জানান, কেউ পাখি শিকার করতে পারবে না। এটি অপরাধ। খোঁজ নিয়ে দেখা হবে কারা পাখির বাসা ভেঙে বাচ্চা বিক্রি করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
daliykalerbangladesh