ঢাকা | বঙ্গাব্দ

“বাংলাদেশের সিরামিক শিল্প: প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে আধুনিক অর্থনৈতিক শক্তি”

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 15, 2025 ইং
ছবির ক্যাপশন:
ad728

আধুনিক শহুরে বাসা-বাড়িতে আরাম ও নান্দনিকতার যোগসূত্র এনে দিয়েছে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি। ঝাঁ চকচকে নানা রংয়ের টাইলসের মেঝে বা পছন্দের নকশায় মোড়ানো দেয়াল, ডাইনিং বা রসূঁইঘরে সাজানো প্লেট-বাটি-গ্লাস, এমনকি বেসিন আর ও বাথরুমের বাথটাব-কমোডটাকেও শৈল্পিক নকশায় দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে সিরামিকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। এ কারণে বাংলাদেশ তো বটেই, গোটা বিশ্বে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি অর্থনীতির এক শক্তপোক্ত ভগ্নাংশ হয়ে উঠেছে নিঃসন্দেহে। 

সিরামিক শিল্প আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়ালেও এর শেকড় কিন্তু অনেক গভীর, সেই প্রাচীন পৃথিবীতে খোঁজ মেলে।

দ্য আমেরিকান সিরামিক সোসাইটি জানাচ্ছে, কয়েক হাজার বছর আগে এই গ্রহের সবচেয়ে প্রাচীন ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে একটি সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি। আমরা গ্রামের যে অতি সাধারণ কুমারের হাতে মাটির হাঁড়ি-পাতিল বানাতে নিপুন কারিগরি দক্ষতা দেখি, এই জাদু শুরু হয়েছিল কয়েক হাজার বছর আগে। খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০০ অব্দ আগের এমনই তৈজসপত্রের খোঁজ মিলেছে, যাকে এ পর্যন্ত পাওয়া বিশ্বের প্রাচীনতম নিদর্শন বলা হয়। আর এশিয়া অঞ্চলে তৈজসপত্র তৈরির প্রাচীনতম নিদর্শন মিলেছে চীনের জিয়ানরেনডং গুহায়।

এই নমুনা খ্রিস্টপূর্ব ১৮ হাজার থেকে ১৭ হাজার বছর আগের। গবেষকদের মতে, এভাবেই তৈজস শিল্প ক্রমশ এগিয়েছে এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি। 

প্রাচীন সিরামিক ইন্ডাস্ট্রির সেই গভীর থেকে একলাফে আধুনিক কালে চলে আসা যাক। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা আর মানুষের চাহিদা পূরণে আজ সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

সেই দৌড়ে বাংলাদেশও থেমে নেই। 

বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ) সূত্রে জানা যায়, আমাদের দেশের সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি তাদের উৎপাদনখাতে বর্তমানে চারটি বৃহৎ অংশ নিয়ে কাজ করছে। টেবিলওয়্যার, টাইলস, স্যানিটারি ওয়্যার এবং সিরামিক ব্রিক। ১৯৫৭ সালে বিজয়পুরে সাদা মাটির সন্ধান এ শিল্পে সম্ভাবনার দ্বার খোলে। 

আমাদের দেশে কেবল খাবার টেবিলে পরিবেশনের জন্য প্লেট-বাটি-গ্লাস দিয়ে শুরু করা এই শিল্পে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে।

এখন দেশে অনেকগুলো  প্রতিষ্ঠান টাইলস, টেবিলওয়্যার, স্যানিটারি পণ্য ও ব্রিক তৈরি করছে। দারুণ সব গুণমানসম্পন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি মিলে বর্তমানে ১.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিতে। এই বিনিয়োগের ৬২ শতাংশ টাইলস, ২৩ শতাংশ টেবিলওয়্যার আর ১৫ শতাংশ স্যানিটারিওয়্যার দখল করেছে। এ দেশের সিরামিকখাতে বিশেষ করে চীন ও মধ্যপ্রাচ্য বড় বিনিয়োগ করেছে। যত বড় বিনিয়োগ তত বড় উৎপাদনসক্ষম আমাদের সিরামিকখাত। টেবিলওয়্যার বছরে ৩০২ মিলিয়ন পিস, টাইলস ২০৭ মিলিয়ন পিস এবং ১৬ মিলিয়ন পিস স্যানিটারিওয়্যার প্রস্তুত হয় বাংলাদেশে। 

দেশের অভ্যন্তরে চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ মেটায় স্থানীয় শিল্প। চাহিদার ৭৪.৩৮ শতাংশ স্থানীয় পণ্যে মিটিয়ে বাকি ২৫.৬২ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। দেশের অভ্যন্তরে বছরে ৬৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের টাইলস, ৭৫ মিলিয়ন ডলারের টেইলওয়্যার এবং ১৮০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের স্যানিটারিওয়্যারের চাহিদা রয়েছে। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলো তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত। 

গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট (জিডিপি)-তে সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের ভূমিকা অনবদ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের জিডিপির শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ এসেছে এখান থেকে। ওই বছর ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি এসেছে সিরামিক পণ্য রপ্তানি থেকে। বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশই এসেছে টেবিলওয়্যার রপ্তানি থেকে, যা কিনা মোটের ৯৮ শতাংশ। আর এক শতাংশ করে দখল দিয়েছে টাইলস ও স্যানিটারি পণ্য। মোট আয়ের  ১৭ শতাংশই জার্মানিতে টেবিলওয়্যার রপ্তানির মাধ্যমে এসেছে। 

বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের সিরামিক পণ্য যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- ইউএসএ, কানাডা, ইউকে, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্পেইন, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো। আমাদের দেশের সিরামিক পণ্যের ক্রেতা ইউএসএ'র  ক্রেটঅ্যান্ডব্যারেল, লিবে, পটারি বার্ন, উইলিয়ামস-সোনোমা, মাইকেল আরাম, টেন স্ট্রবেরি স্ট্রিট; ব্রিটেনের রয়্যাল ডল্টোন; ইউরোপের জারা হোম, মোনোপ্রিক্সের মতো ব্র্যান্ডগুলো।  

দেশের সিরামিক শিল্প সম্প্রতি আরো আধুনিক ও যুগপৎ হয়েছে। তারা এখন 'অ্যাডভান্সড সিরামিক'-এর দিকে ঝুঁকছে। এই বাড়তি ফিচার তাদেরকে এনার্জি সংরক্ষণ, পানি বিশুদ্ধকরণ, ইলেকট্রনিক ও বায়োমেডিক্যাল ক্ষেত্রগুলোকে সামাল দিতে বেশ সহায়ক হচ্ছে। তবে এই পথ মসৃন ছিল না। ১৯৫৯ সালেই বগুড়ায় টেবিলওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে একটি প্ল্যান্ট তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ১৯৬২-তেই মিরপুর সিরামিক ওয়ার্কস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান ঢাকায় জার্মান প্ল্যান্ট ও প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আসে। গাজীপুর টঙ্গীতে ছিল পিপলস সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, যা সেই সময় পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ নামে পরিচিত, ১৯৬৬ সালে আধুনিক পোরসালিন টেবিলওয়্যার উৎপাদন করে। এভাবে ক্রমশ ১৯৮৫ সালে মোন্নো সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ ইনস্যুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড  (বিআইএসএফ) ও বেঙ্গল ফাইন সিরামিকস লিমিটেড, ১৯৯৩ সালে মধুমতি সিরামিকস লিমিটেড এবং ১৯৯৯ সালে শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড বড় পরিসরে এই শিল্পকে নিয়ে কাজ শুরু করে। 

এদের মধ্যে আরএকে দেশের একমাত্র মাল্টিন্যাশনাল টাইলস ব্র্যান্ড। তাদের রয়েছে এক্সক্লুসিভ টাইলস কালেকশন ও স্যানিটারি ওয়্যারস, যা আপনার কল্পনার ঘরকে সাজাবে নতুন মাত্রায়। রেসিডেনশিয়াল কিংবা কমার্শিয়াল প্রতিটি স্পেসের জন্য আরএকে সিরামিকস-এর রয়েছে বিশেষ টাইলস। আধুনিক ও আকর্ষণীয় লুকের জন্য ৮০x৮০ সেমি রকার সিরিজ কমার্শিয়াল স্পেসের জন্য আদর্শ। ৬০x১২০ সেমি এলিগ্যান্ট স্ল্যাব ইনডোর ও আউটডোর স্পেসকে করে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত। আর ৩০x৬০ সেমি ভিস্তা ও রকার সিরিজ ওয়াল টাইলস দেয়ালকে দেয় প্রাণবন্ত ও দৃষ্টিনন্দন লুক। 

তাছাড়া আরএকে সিরামিকস স্যানিটারি ওয়্যারে এনেছে অভিনব উদ্ভাবন। দেশের প্রথম টাচলেস সেনসেশন ওয়াটার ক্লোজেট, যেখানে রয়েছে হাতের স্পর্শ ছাড়াই ফ্লাশের সুবিধা। এ ছাড়াও রয়েছে ক্লাউড ওয়াল-হাং ওয়াটার ক্লোজেট, যা ছোট ও আধুনিক ওয়াশরুমের জন্য স্মার্ট সমাধান। গুণগত মান, আধুনিক নকশা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরএকে সিরামিকস আজ সবচেয়ে বিশ্বস্ত নাম। কল্পনার ঘর সাজাতে আরএকে সিরামিকস সেরা।

ফুলেফেঁপে উঠতে থাকা এই সিরামিক শিল্পকে দেখভালে ১৯৯২ জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ)। সিরামিক শিল্পের ভবিষ্যত সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে কাজ করছে সংগঠনটি। এ শিল্পে কর্মরতদের  দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও মানসম্পন্ন কাঁচামাল ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী পাঁচ বছরে রপ্তানি আয় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করাই এখন স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : daliykalerbangladesh

কমেন্ট বক্স