ইসলামিক ডেস্ক | কালের বাংলাদেশ
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মানব সমাজের ভিত্তি। ইসলাম একমাত্র দীন, যেখানে ন্যায়, সমতা ও সত্য প্রতিষ্ঠা সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় বিচারকদের ন্যায়নিষ্ঠ থাকা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত। তাই বিচারকদের উচিত, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামের প্রসিদ্ধ চার ইমামের দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নেওয়া।
দুনিয়ার ক্ষণিক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে যদি আখিরাতের অনন্ত সুখ অর্জন করা যায়, তবে সেটিই প্রকৃত সাফল্য। অন্যথায় অন্যায় বিচারের দায়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে—এটি ইসলামের স্পষ্ট বার্তা।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) : ন্যায়ের uncompromising প্রতীক
ইরাকের খলিফা একবার ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-কে বাগদাদের প্রধান বিচারপতির পদ অফার করেন। কিন্তু ইমাম সাহেব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলেন,
“হে খলিফা! আপনার দয়ায় আমি বিচারপতি হতে পারি, কিন্তু আপনার অন্যায়ের পক্ষে আমি কোরআন ও সুন্নাহবিরুদ্ধ কোনো রায় দিতে পারব না।”
এই অকুতোভয় সত্যবচনের কারণে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। তবু তিনি ন্যায় থেকে বিচ্যুত হননি।
ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.) : শরীয়তবিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান
শাসকগোষ্ঠী তাঁকে বলেছিল “হিল্লা বিয়ে জায়েজ” বলে ফতোয়া দিতে। কিন্তু ইমাম মালেক (রহ.) দৃঢ়ভাবে বলেন,
“এটি কোরআনে চিরতরে হারাম করা হয়েছে, আমি এমন ফতোয়া দিতে পারব না।”
এরপর তাঁকে অমানবিকভাবে নির্যাতন করা হয়—একটি অসুস্থ উটনীর পেছনে বেঁধে শহরজুড়ে টেনে নেওয়া হয়। কিন্তু তবুও তিনি ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবিচল থাকেন।
ইমাম শাফিঈ (রহ.) : সত্যের পথে নির্বাসিত জীবন
তাঁকেও রাজনৈতিক চাপে ফতোয়া দিতে বলা হয়েছিল। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলস্বরূপ, তাঁকে বাগদাদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। মিসরের পথে যাত্রাকালে তিনি বলেছিলেন,
“আমি মিসরে যাচ্ছি না, আমি কবরের দিকে যাচ্ছি।”
অবশেষে মিসরে পৌঁছে মৃত্যুবরণ করেন এই ন্যায়বিচারের শহীদ।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) : কোরআনের মর্যাদা রক্ষায় অবিচলতা
এই মহান ইমাম ছিলেন এক লাখেরও বেশি হাদিসের হাফেজ। শাসকরা তাঁকে বলতে চাপ দেয় যে, “কোরআন সৃষ্টি।”
কিন্তু তিনি ঘোষণা দেন, “কোরআন আল্লাহর বাণী, এটি সৃষ্টি নয়।”
ফলে তাঁকে ২৮ মাস কারাবন্দি রাখা হয়, দিনে মাত্র একটি রুটি দেওয়া হতো। তবুও তিনি সত্য থেকে সরে আসেননি।
ইতিহাসের শিক্ষা ও আজকের বাস্তবতা
তৎকালীন শাসকরা নিজেদের খেয়াল ও স্বার্থে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করেছিল—যেমনটি আজও বহু মুসলিম রাষ্ট্রে দেখা যায়। অথচ ইসলাম বলে, “Better several guilty persons escape than that one innocent suffer”—অন্যায়ভাবে একজন নিরপরাধের শাস্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মুসলমানরা মানবপ্রণীত আইন পড়তে পারে, কিন্তু তা মানতে বাধ্য নয় যদি তা কোরআন-সুন্নাহবিরোধী হয়।
আল্লাহর নির্দেশে ন্যায়বিচারের আহ্বান
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের ওপর দৃঢ়ভাবে কায়েম থাক। ন্যায়বিচার করতে গিয়ে নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।”
— (সুরা আন-নিসা: ১৩৫)
আরও বলেন—
“মানুষকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো। যারা আল্লাহর নাজিল করা বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।”
— (সুরা আল-মায়িদা: ৪৫)
হাদিসে এসেছে—
“যে ব্যক্তি জেনে শুনে অন্যায়ভাবে রায় দেয়, সে জাহান্নামে যাবে।”
— (সুনানে আবু দাউদ ও সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৬৬৬৬)
উপসংহার
ন্যায়বিচার ইসলামের প্রাণ। বিচারকের কলমের কালি যেন কোনো প্রভাব, ভয় বা স্বার্থের কাছে বিকৃত না হয়—এটাই ইসলামের শিক্ষা। চার ইমামের মতো সাহস, সততা ও আল্লাহভীতি আমাদের বিচারব্যবস্থায় ফিরে এলে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে, অন্যায় হবে পরাভূত।
আল্লাহ আমাদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তৌফিক দান করুন।
আমিন।
daliykalerbangladesh